মঙ্গলবার   ১৫ অক্টোবর ২০১৯   আশ্বিন ২৯ ১৪২৬   ১৫ সফর ১৪৪১

চট্টলার বার্তা
১৪১

সংকট সামলে হালদাপাড়ের হাসি

মোহাম্মাদ রুহুল আমীন

প্রকাশিত: ১০ জুন ২০১৯  

কার্প–জাতীয় মাছের (রুই, কাতল, মৃগেল, কালবাউশ) অন্যতম প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদী। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম সালদা থেকেই হালদা নামের উৎপত্তি। সালদা গ্রামের সৃষ্ট হালদাছড়া মানিকছড়ি খালের সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রথমে হালদা খাল এবং পরে ফটিকছড়ির ধুরং খালের সঙ্গে মিলিত হয়ে হালদা নদীতে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ হালদা নদী চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার কালুরঘাট নামক স্থানে কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

প্রতিবছর স্থানীয় লোকজন উৎসবমুখর পরিবেশে রুই–জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে এই নদী থেকে। ডিম আহরণের এই রেওয়াজ যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুন মাসের একটি বিশেষ মুহূর্তে ও বিশেষ পরিবেশে মা মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার বিশেষ সময়কে ‘তিথি’ বলা হয়ে থাকে, যা স্থানীয় লোকজনের কাছে ‘জো’ নামে পরিচিত। এই জোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সঙ্গে প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ বৃষ্টিপাত হতে হবে। এই বৃষ্টিপাত শুধু স্থানীয়ভাবে হলে হবে না, নদীর উজানেও হতে হবে। প্রবল বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের পানি অত্যন্ত ঘোলা ও খরস্রোতা হয়ে ফেনা আকারে প্রবাহিত হয়। জোর আরও একটি বৈশিষ্ট্য জোয়ার–ভাটার জন্য অপেক্ষা করা। পূর্ণ জোয়ারের শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয়, তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে।

প্রতিবছরের মতো এ বছরও ডিম সংগ্রহকারীরা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে ডিম সংগ্রহের জন্য জাল, নৌকা ও অন্য সরঞ্জামাদিসহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু অনুকূল পরিবেশ না থাকায় প্রজনন মৌসুম শেষ হতে চললেও কাঙ্ক্ষিত ডিমের দেখা মেলেনি, ফলে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হতে থাকে। এর মধ্যে ঘটে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। গত ২৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেলসড়কের সেতু ভেঙে তেলবাহী একটি ওয়াগন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় মরাছড়ায় পতিত হয়। প্রতিটি ওয়াগনে ফার্নেস তেল ছিল প্রায় ২৫ হাজার লিটার। মুহূর্তেই বেশির ভাগ তেল ছড়িয়ে পড়ে, যার শেষ গন্তব্য ছিল হালদা নদী। হালদাদূষণ রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ত্বরিত পদক্ষেপের মাধ্যমে ফার্নেস তেলের ছড়িয়ে পড়া রোধে আড়াই কিলোমিটার খালের মধ্যে ১২টি বাঁধ নির্মাণ করে পাঁচ দিন টানা কাজ করে প্রায় শতভাগ তেল অপসারণ করে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা প্রশাসনের প্রাণান্তকর চেষ্টায় হালদা নদী ভয়াবহ দূষণ থেকে রক্ষা পায়।

অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটে, গত ২৫ মে সকালে অল্প কিছু নমুনা ছেড়ে রাত থেকে পূর্ণ মাত্রায় ডিম ছাড়তে শুরু করে মা মাছ। ডিম সংগ্রহ করতে নদীতে নামে ২৩০টি নৌকা। রাত থেকে পরদিন সকাল নয়টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে ডিম সংগ্রহের যজ্ঞ। হ্যাচারি ও মাটির কুয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এবার প্রায় ১০ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ডিমের পরিমাণ তুলনামূলক কম হলেও বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনায় এই পরিমাণ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। 

২. ডিম সংগ্রহ শেষে স্থানীয়ভাবে তৈরি ১৪১টি মাটির কুয়া ও ১৩১টি হ্যাচারির কুয়ায় শুরু হয় ডিম পরিস্ফুটনের কাজ। চার দিন পরিচর্যার পর উৎপাদিত রেণু বিক্রির উপযোগী হয়। মৎস্যখামারিরা চার দিন বয়সী এসব রেণু প্রথমে নার্সারি পুকুরে পরিচর্যা করে পরবর্তী সময়ে পুকুরে কিংবা জলাধারে ছাড়েন। শুরুতে বিগত বছরগুলোর ডেটা বিশ্লেষণে এবার রেণু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১১৭ কেজি। পরবর্তী সময়ে চতুর্থ দিন সরেজমিন ডেটা সংগ্রহের পরে প্রায় ২০০ কেজি রেণু উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও প্রায় ৮০ কেজি বেশি রেণু উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ লাখ টাকা (প্রতি কেজি ৮০ হাজার টাকা হারে)। রেণু উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি ডিম কম পাওয়ার আক্ষেপ অনেকাংশে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে। সরেজমিন হ্যাচারি পরিদর্শনে উৎসবের আমেজ পরিলক্ষিত হয়। গত বছর ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম থেকে রেণু পাওয়া গিয়েছিল ৩৭৮ কেজি। অন্যদিকে, এই বছর ১০ হাজার কেজি ডিম থেকে রেণু মিলেছে ২০০ কেজি। ডিম সংগ্রহকারীদের মতে, এই বছর ডিম নষ্ট হয়নি বলেই রেণু উৎপাদনের হার বেশি। গত বছরের তুলনায় এই বছর ডিম ফুটানোর সরকারি কুয়ার সংখ্যা দেড় গুণ বেশি।

কুয়া কম থাকায় গত বছর নির্ধারিত পরিমাণের তিন গুণ বেশি ডিম একটা কুয়াতে ডিম সংগ্রহকারীরা ফুটানোর চেষ্টা করেছেন, ফলে অনেক ডিম নষ্ট হয়েছে। এবার ডিম আহরণকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিটি কুয়ায় ডিমের পরিমাণ চার বালতি (৪০ কেজি) নির্ধারণ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। ফলে, ডিম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ছিল না। গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় প্রশাসনের নিবিড় তদারকি। মা মাছ শিকার ও বালু উত্তোলন বন্ধ করার লক্ষ্যে দিনরাত চলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। আট মাসের ৫৬টি অভিযানে দেড় লক্ষাধিক মিটার জাল জব্দ করা হয়, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকা ধ্বংস করা হয় দেড় ডজন। হালদা গবেষক এবং ডিম সংগ্রহকারীদের মতে, প্রশাসনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এই বছর হ্যাচারিগুলোয় ডিম পরিস্ফুটনের কাজ অত্যন্ত সুন্দর ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। হাটহাজারী অংশের তিনটি হ্যাচারির প্রায় ৭০ ভাগ কুয়াই (সিস্টার্ন) প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিত্যক্ত ছিল। ডিম ছাড়ার প্রায় দুই মাস আগেই শতভাগ কুয়া ব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলে উপজেলা প্রশাসন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়। সর্বোপরি ভয়াবহ তেল দূষণের হাত থেকে হালদা বাঁচাতে প্রশাসনের জান বাজি রাখা উদ্যোগ। হালদার প্রতি যথাযথ মনোযোগে ডিম আহরণকারীদের অতিরিক্ত আর্থিক প্রাপ্তি প্রায় ৬৪ লাখ টাকা আর পোনার সংখ্যা হিসাব করলে অতিরিক্ত পোনা প্রাপ্তি প্রায় দেড় কোটি (প্রতি কেজি রেণুতে আনুমানিক দুই লাখ পোনা থাকে)। স্বল্প অর্থ ব্যয় আর প্রশাসনের আন্তরিকতাপূর্ণ উদ্যোগ ডিম সংগ্রহকারীদের মুখে এনে দিয়েছে চওড়া হাসি। সেই হাসি অমলিন থাকুক মৌসুম থেকে মৌসুমে।

মোহাম্মাদ রুহুল আমীন: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। হাটহাজারী, চট্টগ্রাম

চট্টলার বার্তা
চট্টলার বার্তা
এই বিভাগের আরো খবর